প্রাচীন গণিতবিদদের উক্তি ও আবিষ্কার: পিথাগোরাস থেকে আল-খোয়ারিজমি
আজ আমরা স্কুলে যে জ্যামিতি, বীজগণিত ও ত্রিকোণমিতি পড়ি, তার শিকড় হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন গ্রিস, ভারত ও বাগদাদের গণিতবিদরা এর ভিত্তি গড়েছিলেন। এই লেখায় ছয়জন প্রাচীন গণিতবিদের উক্তি বা তাঁদের লেখার অংশ, আর তাঁদের আবিষ্কার আজকের পাঠ্যবইয়ে কোথায় আছে তা দেখব।
প্রাচীন গণিতবিদদের নিজের লেখা অনেক সময় হারিয়ে গেছে, তাই কিছু উক্তি পরবর্তী লেখকদের বর্ণনা থেকে নেওয়া। সেগুলোর উৎস পাশে উল্লেখ করা হয়েছে।
১. পিথাগোরাস (খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতক)
“All is number.”
“সবকিছুই সংখ্যা।”
পিথাগোরাস ও তাঁর অনুসারীরা বিশ্বাস করতেন জগতের মূলে আছে সংখ্যা ও অনুপাত।
আজকের পাঠে: তাঁর নামের উপপাদ্য a² + b² = c² বিস্তারিত পড়ুন পাইথাগোরাসের উপপাদ্য লেখায়।
২. ইউক্লিড (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সাল)
“There is no royal road to geometry.”
“জ্যামিতি শেখার কোনো রাজকীয় সহজ পথ নেই।”
আজকের পাঠে: ইউক্লিডের Elements প্রায় দুই হাজার বছর জ্যামিতির পাঠ্যবই ছিল। এই বইয়েই আছে মৌলিক সংখ্যা অসীম — এর বিখ্যাত প্রমাণ। দেখুন মৌলিক সংখ্যা।
৩. আর্কিমিডিস (খ্রিস্টপূর্ব ২৮৭–২১২)
“Give me a place to stand and I will move the earth.”
“আমাকে দাঁড়ানোর একটি জায়গা দাও, আমি পৃথিবীকে নাড়িয়ে দেব।”
আজকের পাঠে: লিভারের নীতি, প্লবতার সূত্র এবং π-এর মান ৩১০⁄৭১ ও ৩১⁄৭-এর মধ্যে — এই হিসাব আর্কিমিডিসের। বৃত্তের ক্ষেত্রফল ও পরিধির সূত্রে π ব্যবহার করুন আমাদের বৃত্তের সমীকরণ ক্যালকুলেটর-এ।
৪. আর্যভট (৪৭৬–৫৫০ খ্রিস্টাব্দ)
“Add four to one hundred, multiply by eight, and add sixty-two thousand. This is approximately the circumference of a circle whose diameter is twenty thousand.”
“একশোর সঙ্গে চার যোগ করো, আট দিয়ে গুণ করো, তারপর বাষট্টি হাজার যোগ করো। বিশ হাজার ব্যাসের একটি বৃত্তের পরিধি প্রায় এটুকু।”
হিসাব করলে (১০০+৪)×৮+৬২০০০ = ৬২৮৩২, আর ৬২৮৩২ ÷ ২০০০০ = ৩.১৪১৬। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে π-এর এত নিখুঁত মান!
আজকের পাঠে: আর্যভট সাইন (জ্যা) সারণি তৈরি করেছিলেন — আধুনিক ত্রিকোণমিতি-র শুরুটা এখান থেকেই।
৫. ব্রহ্মগুপ্ত (৫৯৮–৬৬৮ খ্রিস্টাব্দ)
ব্রহ্মগুপ্ত তাঁর ব্রাহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত (৬২৮ খ্রি.) গ্রন্থে শূন্যকে একটি সংখ্যা হিসেবে ধরে এর হিসাবের নিয়ম লিখেছিলেন — যেমন কোনো সংখ্যা থেকে সেই সংখ্যাই বিয়োগ করলে শূন্য হয়, আর যেকোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে শূন্য হয়। ঋণাত্মক সংখ্যা নিয়েও নিয়ম দিয়েছিলেন তিনি; ঋণাত্মককে বলতেন “ঋণ”, ধনাত্মককে “ধন”।
আজকের পাঠে: দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধানের একটি সাধারণ নিয়মও তিনি দিয়েছিলেন। দেখুন দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের পদ্ধতি।
৬. আল-খোয়ারিজমি (আনুমানিক ৭৮০–৮৫০ খ্রিস্টাব্দ)
“…what is easiest and most useful in arithmetic, such as men constantly require in cases of inheritance, legacies, partition, law-suits, and trade…”
“…গণিতের যা সবচেয়ে সহজ ও সবচেয়ে কাজের, যা মানুষের সবসময় দরকার হয় উত্তরাধিকার, সম্পত্তি ভাগ, মামলা ও ব্যবসার হিসাবে…”
আল-খোয়ারিজমি গণিতকে দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন।
আজকের পাঠে: তাঁর বই আল-জাবর থেকে এসেছে “অ্যালজেবরা” (বীজগণিত) শব্দ, আর তাঁর নাম থেকে “অ্যালগরিদম”। সমীকরণ সমাধানে হাত পাকাতে ব্যবহার করুন দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানকারী।
এক নজরে প্রাচীন গণিতের অবদান
- পিথাগোরাস — সমকোণী ত্রিভুজের সম্পর্ক, সংখ্যার দর্শন
- ইউক্লিড — স্বতঃসিদ্ধভিত্তিক জ্যামিতি, অসীম মৌলিক সংখ্যা
- আর্কিমিডিস — π-এর হিসাব, লিভার ও প্লবতা
- আর্যভট — π ≈ ৩.১৪১৬, সাইন সারণি
- ব্রহ্মগুপ্ত — শূন্য ও ঋণাত্মক সংখ্যার নিয়ম
- আল-খোয়ারিজমি — বীজগণিত ও অ্যালগরিদম
আরও উক্তি পড়ুন গণিত নিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের ২৫টি উক্তি এবং বাঙালি গণিতবিদদের কথা জানুন এই লেখায়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
শূন্যকে সংখ্যা হিসেবে প্রথম কে ব্যবহার করেন?
ভারতীয় গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে শূন্য দিয়ে হিসাবের নিয়ম লিখে যান, যা শূন্যকে পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা হিসেবে ব্যবহারের প্রাচীনতম লিখিত দৃষ্টান্তগুলোর একটি।
“অ্যালগরিদম” শব্দটি কোথা থেকে এসেছে?
নবম শতকের গণিতবিদ আল-খোয়ারিজমির নামের লাতিন রূপ থেকে।
আর্যভট π-এর মান কত দিয়েছিলেন?
প্রায় ৩.১৪১৬ (৬২৮৩২ ÷ ২০০০০), যা আধুনিক মানের খুব কাছাকাছি।