৫ জন বাঙালি গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী: জীবন, অবদান ও অনুপ্রেরণা
বাঙালির গণিত ও বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস গর্ব করার মতো। এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয় থেকে কোয়ান্টাম পরিসংখ্যান, পরিসংখ্যানের আধুনিক পদ্ধতি থেকে মহাবিশ্বের পরিণতি — সবখানে বাঙালি গণিতবিদদের অবদান আছে। এখানে রইল পাঁচজন অনুপ্রেরণাদায়ী বাঙালি গণিতবিদ ও বিজ্ঞানীর জীবন ও অবদান।
১. রাধানাথ শিকদার (১৮১৩–১৮৭০)
কলকাতার হিন্দু কলেজের ছাত্র রাধানাথ শিকদার ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভের “কম্পিউটার” — অর্থাৎ যিনি হাতে জটিল হিসাব করতেন। ১৮৫২ সালের দিকে তাঁর হিসাব থেকেই জানা যায় “পিক XV” পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, যা পরে মাউন্ট এভারেস্ট নামে পরিচিত হয়।
শিক্ষা: ত্রিকোণমিতি শুধু বইয়ের বিষয় নয় — এর সাহায্যেই পাহাড়ের চূড়ায় না উঠে তার উচ্চতা মাপা যায়।
২. সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৮৯৪–১৯৭৪)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সময় ১৯২৪ সালে সত্যেন্দ্রনাথ বসু আলোর কণা গণনার একটি নতুন পরিসংখ্যান পদ্ধতি বের করে আইনস্টাইনকে পাঠান। আইনস্টাইন নিজে তা জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। এখান থেকেই এসেছে “বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান”, আর তাঁর নামে এক শ্রেণির কণার নাম “বোসন”। তিনি মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার জোরালো সমর্থক ছিলেন এবং ১৯৪৮ সালে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন।
“যাঁরা বলেন বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব নয়, তাঁরা হয় বাংলা জানেন না, নয় বিজ্ঞান বোঝেন না।”
মাতৃভাষায় গণিত শেখা দুর্বলতা নয় — বরং বোঝার সবচেয়ে সহজ পথ। এই সাইটের লক্ষ্যও সেটাই।
৩. প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ (১৮৯৩–১৯৭২)
প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ভারতে আধুনিক পরিসংখ্যানের পথিকৃৎ। ১৯৩১ সালে তিনি কলকাতায় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন এবং “সংখ্যা” নামে পরিসংখ্যানের জার্নাল চালু করেন। তাঁর উদ্ভাবিত “মহলানবিশ দূরত্ব” আজও ডেটা সায়েন্স ও মেশিন লার্নিংয়ে ব্যবহৃত হয়। বড় পরিসরে নমুনা জরিপের পদ্ধতিতেও তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা: পরিসংখ্যান মানে শুধু গড় বের করা নয় — দেশের পরিকল্পনাও এর ওপর দাঁড়িয়ে। হাতে-কলমে দেখতে আমাদের পরিসংখ্যান ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন।
৪. কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭–১৯৮১)
কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানের শিক্ষক এবং বাংলাদেশে পরিসংখ্যান চর্চার অন্যতম পথপ্রদর্শক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ISRT) প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। তিনি জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত হন। গণিতের পাশাপাশি তিনি ছিলেন সাহিত্যিক এবং দাবাড়ু — দাবা আর পরিসংখ্যান, দুটোই যুক্তির খেলা।
৫. জামাল নজরুল ইসলাম (১৯৩৯–২০১৩)
গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নেন এবং সেখানে গবেষণা করেন। তাঁর বই The Ultimate Fate of the Universe (১৯৮৩) মহাবিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখা এক বিখ্যাত গ্রন্থ। বিদেশে উজ্জ্বল ক্যারিয়ার ছেড়ে তিনি দেশে ফিরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গাণিতিক ও ভৌত বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলেন।
শিক্ষা: মহাবিশ্বের মতো বড় প্রশ্নের উত্তরও খোঁজা হয় সমীকরণ দিয়ে — ক্যালকুলাস সেই যাত্রার প্রথম ধাপ।
তাঁদের জীবন থেকে আমরা কী শিখি
- ভালো সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও গভীর মনোযোগ দিয়ে বিশ্বমানের কাজ করা যায়।
- গণিতের প্রয়োগ সবখানে — ভূগোল, পদার্থবিদ্যা, অর্থনীতি, পরিকল্পনা।
- মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শেখা ও শেখানো সম্ভব এবং জরুরি।
বিশ্বের বিখ্যাত গণিতবিদদের কথা পড়ুন গণিত নিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের ২৫টি উক্তি লেখায়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
বাঙালি বিজ্ঞানীর নামে কোন কণার নাম রাখা হয়েছে?
সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে “বোসন” কণার নামকরণ হয়েছে।
মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা কে হিসাব করেছিলেন?
গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভের বাঙালি গণিতবিদ রাধানাথ শিকদারের হিসাব থেকেই পিক XV-কে সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
মহলানবিশ দূরত্ব কোথায় ব্যবহৃত হয়?
পরিসংখ্যান, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং ও অস্বাভাবিক ডেটা শনাক্তকরণে।